হজ্জের প্রস্তুতি: পর্ব -১( preparation for Hajj : part-1

হাজ্জ এর প্রস্তুতি নিবেন কীভাবে: পর্ব -১

(Preparation for Hajj: part-1)

কাজী মুহাম্মদ ওমর ফারুক,পি এইচ ডি
Executive Director
Dhaka Sirat Study Center
Email: omortdu@gmail.com


সূচনা বক্তব্য:

হাজ্জ একটি ফারজ ইবাদাত। এটিকে ইবাদাত হিসেবে বিবেচনা করে প্রস্তুতি নিতে হবে। সফর বা বিদেশ ভ্রমন হিসেবে দেখা মোটেই উচিত নয়। যদিও এ হাজ্জ্ অনেকের জন্য প্রথম বিদেশ ভ্রমণ তবুও সর্বদা মাথায় একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে যে, আমি খালেস ভাবে মহান আল্লাহ ﷻ -এর নির্দেশ এবং রাসূলুল্লাহ -এর নির্দেশ মেনে আবশকীয় ফরজ ইবাদাত হিসেবে আমি পবিত্র কাবা জিয়ারবতে যাচ্ছি। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, আপনি যদি সঠিক নিয়ত করতে পারেন, তাহলে আপনার একদিকে ফরজিয়াত আদায় হয়ে যাবার পাশাপাশি একটি ভালো মানের ভ্রমণ বা সফরের কাজও সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। বুখারী শরীফের ১ম হাদীসটি যা ওমর ইবনে খাত্তাব রা: আমাদের জানিয়েছেন তাহলো:

 إنَّما الأَعمالُ بالنِّيَّات 
নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।


প্রাথমিক প্রস্তুতিসমূহ:

১) নিয়তকে সহিহ করুন: হজ্ব শুরুর আগে নিয়তকে সহিহ করুন। একমাত্র আল্লাহﷻ-কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এ হজ্ব করছেন বলে মনস্থির করুন। কোন রাজনৈতিক ফায়দা বা হাজী উপাধী লেখার খায়েশ থাকলে এখনই তাওবা করে নিয়্যাত খাঁটি ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারণ করুন।

২) তাওবা করুন: আজ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আর আল্লহ ﷻ- নাফরমানি করব না। কি করলে আল্লাহ খুশি হবেন আর কি করলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন তা জানব ও মানব মর্মে তাওবা করুন। তাওবা মানে “ফিরে আসা”। দুনিয়ার লোভ লালসা থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার চূড়ান্ত ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার নামই হলো তাওবা।

৩) গোপনীয়তা রক্ষা করুন: যা আমল করবেন, গোপনে করার চেষ্টা করবেন। হজ্ব চলাকালীন সময়ে দয়া করে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো ইত্যাদিতে দোয়া চেয়ে পোস্ট বা লাইভ শেয়ার করবেন না। সোস্যাল মিডিয়াতে যুক্ত থাকলে লোক দেখানো হয়ে যায়, মনে রাখবেন, আপনি হাজ্জ বা উমরা করছেন, ঢোল পিটিয়ে বলার দরকার কী? যার জন্য করছেন, তিনি জানলেই তো হলো। 

৪) ধৈয্য ধারণ: হাজ্জ একটি কষ্টকর ইবাদাত। সকল ধরণের কষ্ট মেনে নেয়ার মানসিকতা তৈরী করুন। সাথে থাকা হাজ্বীদের সাথে সদাচরণ করবেন। যাত্রা পথে বিমান বন্দর, বাস, হোটেল, খাবারসহ কাফেলা নেতৃবৃন্দের দুর্ব্যবহার মেনে নেয়ার চেষ্টা করবেন। ধৈয্যহারা হলে আপনারই ক্ষতি।

৫) নফল ইবাদাতের রুটিন: নফল ইবাদাতের রুটিন তৈরী করুন। নফল নামাজ, তিলাওয়াত ও তাসবিহ করে সময় ব্যয় করার জন্য রুটিন তৈরী করুন। সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা পালন করুন। দেখবেন কাবা ও মদীনা মসজিদে সোম ও বৃহস্পতিবার ইফতারীর বিশাল আয়োজন করা হয়। অনেকেই রোজা না রেখে সেখানে ইফতার খেতে বসে পড়ে। রোজা রাখুন। এ দু দিনে রোজা রাখার অভ্যাস তৈরী করুন।

৬) ব্যস্ততা কমান: আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধব পাড়াপড়শি খুঁজতে সময় নষ্ট করবেন না। তাদের পক্ষ থেকে হাদিয়া, খাবার নেয়ার জন্য উৎসাহিত হবেন না। এতে করে ব্যস্ততার কারণে কাবা ঘরে আপনি এক রাকাত সালাত এর পারবর্তে (১,০০,০০০) এক লক্ষ রাকাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়ে যেতে পারে। আবার দুনিয়াবী কাজের ব্যস্ততার কারণে আপনার আমলের একাগ্রতা বিনষ্ট হয়ে যাবে।

৭)মূল কাজ করুন:  ৪/৫ লাখ টাকা খরচ করে আসার একমাত্র কারণ হলো হ্জ্জ। সুতরাং যার জন্য আগমন, তাকে গুরুত্ব দিন। বেশী বেশি আল্লাহর কাছ থেকে তাওফিক কামনা করুন, যেন তিনি হজ্বের সকল আহকাম মেনে চলে শেষ পর্যন্ত হজ্ব সম্পন্ন করার চেষ্টা করব।

৮) আল্লাহর ঘরের সত্যিকারের মেহমান হিসেবে চলার চেষ্টা করবো। আল্লাহﷻ-র ঘরের হক আদায় করব। প্রবেশ-বাহির এর সকল নিয়ম মেনে চলবো।

৯) মোবাইল সেট: সবচেয়ে ভালো হয়, সাধারণ বাটনযুক্ত একটা মোবাইল দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া। টাচ বা এণ্ড্রয়েড মোবাইল না নেয়াই ভালো। এতে সময় বাঁচবে এবং শয়তানের প্ররোচনায় সেল্ফী ও ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন।

প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ


. ইহরামের কাপড়: ইহরামের কাপড় মোটা দেখে টা কিনুন, যেটা তোয়ালে কাপড় দিয়ে বানানো। পাতলা কাপড়েরটা নয়। কারণ তাতে অনেকটা ট্রান্সপারেন্ট হয়ে যায়। আপাতত ১ জোড়া কিনুন দেশ থেকে, মাক্কাহ এসে দেখে শুনে ভালো ১জোড়া নিয়ে নিয়েন, কটনের। দেশের চেয়ে কম দামে পাবেন এবং ভালো কোয়ালিটির।

২. স্যান্ডেল: খুবই ইম্পরট্যান্ট। কারণ হজ্জে প্রচুর হাটতে হবে। নরম,আরামদায়ক, কিন্তু স্ট্রং ২ জোড়া স্যান্ডেল আনবেন। আমি বাটায় গিয়ে বলেছিলাম, প্রচুর হাটা যাবে এমন আরামদায়ক স্যান্ডেল দেন, সেলসম্যান ৩৫০ টাকার একজোড়া স্পঞ্জ টাইপের স্যান্ডেল দিয়েছিল, যা পরে অনেক আরাম পেয়েছিলাম। স্যান্ডেল ২ ফিতার হতে হবে, এমন কোনো কথা নাই, যদিও অনেকে আপনাকে বাধ্য করবে ২ ফিতার নিতে। সবচেয়ে আরামদায়কটা কিনেন। তবে, তাতে যেন পায়ের অধিকাংশ স্থান খোলা থাকে। এটা মুস্তাহাব।


৩. মোবাইল সিম: এয়ারপোর্ট এ ল্যান্ড করে অবশ্যই প্রত্যেক মেম্বারের সবাই মোবাইল সিম নিয়ে নিবেন, পরে নিতে গেলে অনেক কষ্ট হবে। হাজীদের জন্য মোবিলি বেস্ট কারণ খরচ কম। জাইন ও নিতে পারেন। sawa এর নেটওয়ার্ক সবচেয়ে ভালো, তবে sawa নিবেন না। কারণ এখানে প্রায় সবাই sawa ব্যবহার করে এন্ড তাদের অনেক ফ্রি টক্ টাইম থাকে সাওয়া টু সাওয়া । আপনার পরিচিতজন রা আপনাকে ফোন করে ছাড়তে চাইবেনা, গল্প চলবে তো চলবেই। বাঙালি ফ্রি পাইলে যা হয়। আপনি আসছেন এবাদত করতে, এতো বাইক্ক্যা আলাপ করার সময় কৈ? মোবিলি বা জাইন হলে জরুরি আলাপ ছেড়ে তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিবে :) মনে রাখবেন এখানে মেসেঞ্জার, whatsapp, লাইন, ইত্যাদি তে দেশে কথা বলা যাবেনা, শুধু চ্যাট করা যাবে । শুধু imo তে কথা বলা যাবে। সুতরাং আসার আগে আপনার পরিবারের মোবাইল এ ইমো সেটআপ করে আসবেন। এয়ারপোর্ট থেকে সিম কিনার সাথে ডাটা প্যাকেজ এক্টিভেট করে নিবেন ১ অন্তত মাসের জন্য যাতে পরে ঝামেলা করতে না হয়। রাতে খাবারের পরই শুধু পরিবারের সাথে এবকার কথা বলবেন।
মোবাইলে তাদেরকে ইবাদাত, সালাত ও কোরআন তেলাওয়াতের নসিহাত করবেন।

৪. প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র: আশা করি প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সাথে নিচ্ছেন। সাথে একটা টাইগার বাম। হজ্জে কাশি হবার সম্ভাবনা ৯০ পার্সেন্ট। ১ জন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে কাশির, ডায়রিয়ার, গেস্ট্রিকের এবং ব্যাথার ওষুধ অবশ্যই সাথে আনবেন। সৌদিতে ওষুধের অনেক দাম। যাদের প্রেসার, ডাইবেটিক্স ইত্যাদি আছে, পুরা সফরের ওষুধ, পারলে আরো একটু বেশি করে নিয়ে আসবেন। সুস্থ থাকার জন্য পরিমিত খাওয়া-দাওয়া করবেন।

জমজম আর খেজুর খেলে বেশিকিছু না খেলেও চলে। জমজম থাকতে নরমাল পানি কেন খাবেন? 

৫. হালকা শীতের কাপড়: একটা হালকা শীতের কাপড় এবং একটা মাফলার মিনায় খুব কাজ দেবে। সবসময় চেষ্টা করতে হবে ঠান্ডা না লাগাতে। ঠান্ডা পানি বা ঠান্ডা জুস্ খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। পুরা সফর সুস্থ থাকার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবেন। এসির বাতাস সরাসরি গায়ে লাগাবেন না, তা যতই আরামদায়ক হোক। মিনায় আমি খাটে না শুয়ে ২ খাতের মাজখানে ফ্লোর এ শুইতাম যাতে এসি সরাসরি না লাগে। ফলে, আমার গ্রুপ এ সবার কাশি হলেও আলহামদু লিল্লাহ আমার হয়নি। কাপড় চোপড় কম আনবেন। এত কাপড় লাগেনা।

৬. ব্যক্তিগত রান্না: সব হোটেলে চুলার ব্যবস্থা থাকতে পারে। যারা ফ্যামিলিসহ আসছেন, তারা একটা ছোট ফ্রাইপ্যান এন্ড ছোট একটা ইলেকট্রিক ওয়াটার হিটার নিয়ে আসতে পারেন। যাতে ডিম ভেজে খেতে বা চা খেতে প্রব্লেম না হয়। অনেক চা খেতে ইচ্ছা করবে কিন্তু চায়ের জন্য যেই লম্বা লাইন তা থেকে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থা। চুলা না থাকলেও ইলেকট্রিক কেটেল এ ডিম সিদ্ধ করতে পারবেন। 

এখানে আপনি আল্লাহﷻ-র মেহমান। মেহমানের মতো আচরণ করবেন। ৪/৫ মিলিয়ন মানুষ একজায়গায় থাকবেন, অনেক কারণে রাগ উঠতে পারে। কিন্তু রাগবেননা। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। আল্লাহর মেহমানরা রাগতে পারেনা। কোনো কারণেও না। আমার এক আত্মীয় পরীক্ষা করেছিলেন উনি সত্যিই আল্লাহর মেহমান কিনা। প্রথম দিন উমরাহ সেরে ক্লান্ত হয়ে যখন হারাম এর মাঠে বসলেন, তখন মনে মনে বললেন - আমরা না আল্লাহর মেহমান? আল্লাহ কি আমাদের জন্য একটু আপ্পায়নের ব্যবস্থা করবেন না? এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোত্তেকে এক লোক এসে উনার হাথে জুস্ সহ বেশ কিছু খাবার দিয়ে মুহূর্তেই উদাও। তখন উনি একটু লজ্জ্যাই পেলেন বটে। আমি মালয়েশিয়ান খাবার পছন্দ করি। আমিও হজ্জে এসে প্রথম উমরা সেরে চুল কেটে যখন হোটেলে ফিরছিলাম, এক পিচ্চি এসে আমার হাতে একটা মালয়েশিয়ান খাবারের প্যাকেট দিয়েছিল । আমি অনেক মজা করে খেয়েছিলাম।

ধুমপান কে -‘না’ বলুন: স্মোকিং কুইট করে জন্য হজ্জ্ব হচ্ছে সবচেয়ে বড় সুযোগ। নিয়ত করলেই হবে। এখানে আসর পর স্মোকিংয়ের কথা মাথায়ও আসবেনা। প্রয়োজনে দুয়েকটা নিকোটিন ট্যাবলেট নিয়ে আসতে পারেন প্রথম দুইএকদিনের জন্য। ব্যাস। আল্লার মেহমানরা কি আল্লাহর ঘরে এসে স্মোকিং করতে পারে?

শপিং: বোরকা, খেজুর, গোল্ড, আতর আর জায়নামাজ ছাড়া তেমন কিছু কেনার নাই। বোরকা আর সোনা জেদ্দাহ থেকে কিনতে পারলে ভালো। জেদ্দার বালাদ এলাকায় ভালো পাওয়া যাবে। মক্কাহ থেকে ট্যাক্সিতে জনপ্রতি ১০ রিয়্যাল নিবে জেদ্দাহ বালাদ আসতে। মোবাইল কিনতে চাইলে ও বালাদ ভালো হবে.যেকোনো দেশি দোকানদার কে জিজ্ঞেস করে নিবেন কোন দোকানে কি ভালো হবে।  



জায়নামাজ: জায়নামাজ স্মৃতি হিসেবে ২/১ টা নিতে পারেন। এর চেয়ে বেশী দরকার নাই। ঢাকার চকবাজার, বায়তুল মুকাররাম, চট্রগ্রামের রিয়াজুদ্দিন বাজার, সিলেটের জিন্দাবাজারসহ বাংলাদেশের প্রায় সকল পাইকারী বাজারে সৌদি আরবের মতই বা অনেক সময় কমদামেই উপহার দেয়ার জন্য জায়নামাজ কিনতে পাওয়া যায়। অহেতুক সৌদি থেকে কষ্ট করে বোঝা বহন করে আনবেন কেন? 

Comments

Popular posts from this blog

শুকনো এ মরুভূমিতে দাও তোমার প্রেমের জল

Socio-cultural Condition of Ayyam-i- Jahilia

ভাগ্যবান শহীদ হানজালা রাদিয়াল্লআহু আনহু