মহান স্বাধীনতা দিবস: ইতিহাসের পাতায় বাংলার স্বাধীনতা ও আমাদের করণীয়
মহান স্বাধীনতা
দিবস: ইতিহাসের পাতায় বাংলার স্বাধীনতা ও আমাদের করণীয়
-কাজী মুহাম্মদ
ওমর ফারুক
omortdu@gmail.com
সারসংক্ষেপ:
পৃথিবীর
মানচিত্রে ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ বলে কোন দেশের অস্তিত্ব ছিল না। কারণ এ দেশের সৃষ্টি হয়েছিল নয় মাসের রক্তক্ষয়ী
যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। মহান
আল্লাহর অপার করুণায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার
কৃষক, শ্রমিক, শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সকলে
মিলে মিশে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে প্রায় তিন মিলিয়ন তাজা প্রাণের বিনিময়ে এ দেশকে স্বাধীন
করে আনেন। আজ
আমরা বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছি। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় আমরা
নবতর সংযোজন করতে যাচ্ছি। এসবই
সম্ভব হচ্ছে ছোট্ট একটি শব্দ ‘স্বাধীনতা’-এর মাধ্যমে। একদিনে এ স্বাধীনতা আসেনি। এর ইতিহাস অনেক প্রাচীন ও গভীরে নিবদ্ধ। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ আমরা উদযাপন করছি
স্বাধীনতার ৪৮তম বার্ষিকী। আমাদের
অর্জন অনেক। কিন্তু
আমাদের জাতি হিসেবে যেতে হবে আরো অনেক দূর। উন্নত
দেশের মর্যাদায় পৌঁছতে আমাদের আরো পরিশ্রমী হতে হবে। নিতে হবে আরো দৃপ্ত শপথ। আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষিত রাখতে হলে বিভেদ ভূলে ঐক্যের
সূরতানে এগুতে হবে। দূর্ণীতি
আর অপরাধীদের দমন করতে হবে শক্ত হাতে। অবিচার, অনাচার, সন্ত্রাসী ও জঙ্গীদের রুখতে হবে।‘দলের
চেয়ে দেশ বড়’ এ শ্লোগানকে সামনে রেখে সাজাতে হবে শাসন পরিকল্পনা। তবেই আমরা স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারবো
আর দিতে পারবো আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম উন্নত বাংলাদেশ।
ভূমিকা:
The Social Contacts গ্রন্থে দার্শনিক রুশো বলেন: “Man is born free and everywhere he is in chains”- প্রতিটি মানব সন্তানই
স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু জন্মের পর সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে থাকে। জন্মের সময় বা প্রক্রিয়াটি মহান স্রষ্টা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হুকুমেই ঘটে থাকে। স্রষ্টার
করুণা সকল মানুষের জন্যই সমান। সকল
মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও রঙ্গের ভিন্নতা ছাপিয়ে রক্ত ও মাংশে এবং শাররীক
গঠনে একইরকম মানুষ। সকল
মানুষ একই পিতা-মাতা আদম ও হাওয়ার (আ:)
সন্তান। আরব
কবির বক্তব্যও তাই:
‘জন্মসুত্রে সকল মানব, সম অধিকারের
স্রষ্ট্রা তার সৃষ্টির ঊষালগ্নেই স্বাধীনতার
মূলনীতি ঘোষণা করেছে। একবার ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা:) বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর বুকে তুমি মানুষকে
ক্রীতদাসে পরিণত করেছো, অথচ তার মা তাকে
স্বাধীন মানুষ রূপেই জন্ম দিয়েছেন।’ আলী (রা.) একবার কিছু লোককে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহই
যখন তোমাকে স্বাধীনমানুষ করে সৃষ্টি করেছেন,
তখন
কোনো মানুষ কখনো তোমাকে দাস বানাতে পারে না।’ আল্লাহ মানুষকে
স্বাধীন করেই সৃষ্টি করেছেন এবং এই স্বাধীনতা নিয়েই মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং তার জন্মগত
অধিকার হচ্ছে কেউ তাকে তার এই স্বাধীনতা ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না এবং
জোর-জবরদস্তি তাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করবে না। ইসলাম যখন স্বাধীনতাকে তার
মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করে তখন সময়টি ছিল এমন যে, অধিকাংশ মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনীতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে আক্ষরিক অর্থেই
ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল।[2]
পৃথিবীর সকল মানব সদস্যের জন্য বিশ্বনবী (সা:) স্বাধীনতার এক
অমূল্য পাথেয় নিয়ে আসেন আর এটিকে রক্ষার জন্য প্রদান করেন একটি নির্ভূল ঐশি কিতাব,
লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত বিস্ময়কর সংবিধান,
বিজ্ঞানময় কুরআনুল কারীম। মহান আল্লাহর নেয়ামাত বাংলা ভাষার কেন্দ্রভূমি বাংলা
অঞ্চলের স্বাধীনতা সে পথচলারই এক অপ্রতিরোধ্য বিকাশ। প্রায় ২০০ বছরের
উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের করালগ্রাস থেকে স্বধীনতা
লাভের পর পাকিস্থানী
শাসক গোষ্ঠির অন্যায় ও অনৈতিক
শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা প্রিয় জনগণ বিদ্রোহ
করে। ২৬শে মার্চ
তারিখটিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বা বাংলাদেশের
জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করা
হয়। ১৯৭১ সালের ২৫
মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতার
সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশে
জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করার
সিদ্ধান্ত
হয় এবং সরকারিভাবে এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বাংলার সংক্ষিপ্ত প্রাচীন ইতিহাস
প্রাচীন বাংলা
বাংলা বলতে বর্তমান
প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ত্রিপুরা এবং আসামের বরাক উপত্যকার বিগত চার সহস্রাব্দের ইতিহাসকে বোঝায়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ এক অর্থে বাংলা অঞ্চলকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে
বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের ইতিহাসে বাংলা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। প্রায়
চার সহস্রাব্দ পূর্বে বাংলায় সভ্যতার ক্রমবিকাশ শুরু হয়।প্রাচীন গ্রীক ও রোমান ভাষায় এই অঞ্চলকে
গঙ্গারিডই নামে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিন এশিয়ার ইতিহাসে বাংলা বরাবরই একটি
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাচীন বাংলা কয়েকটি জনপদে বিভক্ত ছিল এবং বেশ
কিছু প্রাচীন শহর বৈদিক যুগে পত্তন হয়েছিল বলে ধারনা করা হয়। প্রাচীন
বাংলার অধিবাসীরা ভারত মহাসাগরে অবস্থিত বিভিন্ন দ্বীপে উপনিবেশ স্থাপন
করেছিল। পারস্য, আরব এবং ভূমধ্যসাগরিয়
অঞ্চলের সাথে বাংলার দৃঢ় বানিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এই অঞ্চল মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্য সহ আরো অনেক ভারতীয় সাম্রাজ্যের
অংশ ছিল। বাংলা বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক শাসকদের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।প্রাচীন
দূর্গ শহর গৌড়, বহু বছর ধরে
বাংলার রাজধানী ছিল। (৮ম থেকে ১১ শতকে) বৌদ্ধ শাসক পাল আমলে এবং (১১ থেকে ১২
শতকের) হিন্দু শাসক সেন আমলে আমলে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড় ছিল। সেন রাজারা
বাংলার এক বৃহদাংশের ওপর শাসন চালাতেন, কিন্তু তারা গর্ববোধ করতের নিজেদেরকে
গৌড়েশ্বর বা গৌড়ের রাজা বলতে।[3] এই সময়ে বাংলা ভাষা,
সাহিত্য, সঙ্গীত,
কলা
এবং স্থাপত্যের প্রভূত উন্নতি হয়।ত্রয়োদশ শতক থেকে এ বাংলা অঞ্চল মুসলমান
সুলতানদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। মূলত বাংলার স্বাধীনতা বা স্বাধীন অস্তিত্ব আমরা
মুসলিম বাংলার আমল থেকে দৃশ্যপটে দেখতে থাকি। এর আগে বাংলা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি জনপদে
বিভক্ত।
তুর্কী মুসলিম শাসকদের অধীনে বাংলা
১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ী মুহাম্মদ ঘোরীর এ
অঞ্চলে রাজ্য শাসনের সূচনার পর ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার
খলজির বাংলা বিজয় বাংলার শাসন ইতিহাসে একটি বিশেষ ঘটনা। তবাকাতে নাসিরী গ্রন্থের
লেখক মিনহাজে সিরাজের বিবরণে জানা যায় তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন
বখতিয়ার খলজি বাংলা জয় করে এর রাজধানী গৌড় থেকে লখণৌতে পরিবর্তন করেন। এ সময় থেকে
বাংলার স্বাধীন অস্তিত্ব সূচিত হয়। কিন্তু ১২২৫ সালের দিকে দিল্লীর সুলতান
ইলতুতমিশ বাংলা দখলের জন্য আসলে বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন ইওজ খলজি কৌশলে
সন্ধির মাধ্যমে দিল্লীর শাসককে উপহার প্রদান করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে
সক্ষম হন। এর পর ১২২৭ থেকে ১২৮১ পর্যন্ত মোট ১৫ জন সুলতান বাংলা শাসন করেন। তারা
অনেকেই এ সময় দিল্লীর প্রতি মৌখিক অনুগত থাকলেও প্রায় স্বাধীনভাবেই বাংলা শাসন
করতেন। শেষ সুলতান মুঈজউদ্দিন তুঘরল স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিল্লীর অধিনতা মুক্ত হন।
দিল্লীর শাসকরা অনেক কষ্টে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে এর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। কিন্তু
বাংলাকে কেউ কোন দিন দাবিয়ে রাখতে পারেনি। দিল্লীর শাসকের সন্তান বা প্রতিনিধি
যাকেই বাংলা শাসনের জন্য পাঠানো হতো, তিনিই এখানে এসে আর পরাধীন থাকতে চাইতেন
না। স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। এ যেন বাংলার আবহমান বৈশিষ্ট্য-
স্বাধীন আছি, স্বাধীন থাকবো, পরাধীনতা
কভূ নয়। কবি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এ কথারই প্রতিধ্বাণ শুনিঃ
“স্বাধীন-হীনতায় কে বাঁচিতে
চায় হে, কে বাঁচিতে চায় হে?
দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়?”।।
বাংলার বলবনী শাসন ও স্বাধীন সালতানাত
দিল্লীর শাসক সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন তদীয় পুত্র নাসির
উদ্দিন মাহমুদ বুঘরা খানকে (১২৮১-৮৭) লখণৌতির শাসক নিযুক্ত করেন।
প্রথমে দিল্লীর অনুগত থাকলেও পিতার মুত্যুর পর বুঘরা খান স্বাধীনতা ঘোষণা
করেন। এ স্বাধীনতা ১৩২৪ সাল পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল। এসময়কালেই সমগ্র বাংলাদেশ চারটি
সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিভক্ত হয়ে যায়- লখনৌতি, সাতগাঁও (সপ্তগ্রাম), সোনারগাঁও
(সুবর্ণ গ্রাম) এবং চাটগাঁ (চট্টগ্রাম)।[4] এ সময়
বাংলার অর্থনৈতিক প্রাচুয যেমন ছিল, তেমনি এর জলবায়ুর উষ্ণ
আদ্রতা পশ্চিম দেশীয়গণের জন্য ছিল অসহনীয় ও কষ্টকর। সেজন্য পশ্চিমা ভ্রমণকারী ইবনে
বতুতা বাংলাদেশের নামকরণ করেছেন “দোজখপুর আজ নিয়ামাত” ধন সম্পদে পরিপূর্ণ নরক (A hell crammed with
blessings).[5]
১৩২৪ সালে দিল্লীর শাসক গিয়াস উদ্দিন তুঘলক বাংলা দখল করে
এটিকে তিনটি ইকাতয় বিভক্ত করেন-লখনৌতি,
সাতগাঁও , সোনারগাঁও। প্রতিটি ইকতায় একজন করে
গর্ভনর নিযুক্ত ছিল। ইলিয়াসশাহী আমলে এ অবস্থার অবসান ঘটে।
বাংলায় ইলিয়াসশাহী শাসন
১৩৩৮-১৫৩৮ সাল পর্যন্ত বাংলার দু’শ বছরের সা্ধীনতা
শুরু হয়। কারণ এ সময়ে লখণৌতি-এর পরিবর্তে বাংলা নামের ব্যবহার শূরু হয়।
ইলিয়াস হাজী বা সুলতান শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে একীভূ করে একক
শাসনাধীন আনেন। ঐতিহাসিক একডালা দূর্গ ও দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহের শাহের
তার যুদ্ধের নানাবিধ ঘটনাবলী বাংলার ইতিহাসে বীরত্ব ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সংযোজন
করেছে। প্রথম বাঙ্গালার স্বাধীনতার জন্য তিনি শাহ-ই বাঙ্গালা, শাহ-ই-বাঙ্গালীয়ান এবং সুলতান-ই-বাঙ্গালা
রুপে অভিহিত হতে থাকেন। এমনকি দিল্লীর সাথে সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে বাংলার
সীমানাও নির্ধারিত হয়। তার আমলে বাংলার সীমানা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসময়ে কামরুপ
বাংলার শাসনাধীনে আসে। এসময় বাংলার স্থাপত্য শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বাংলা
পিডিয়ার বিবরণে এসময়কার কয়েকটি স্থাপত্যিক নিদর্শনের নাম হলো: গুণমন্ত মসজিদ (পনেরো
শতকের মধ্যভাগ), তাঁতীপাড়া মসজিদ (আনু. ১৪৮০), দরসবাড়ি মসজিদ (১৪৭৯), গৌড়-লখনৌতির ছোট সোনা মসজিদ (১৪৯৪-১৫১৯) ও বড় সোনা মসজিদ (১৫২৬), রাজশাহীর বাঘা মসজিদ (১৫২২) ও কুসুম্বা মসজিদ (১৫৫৮) এবং বারো বাজারের (যশোর) সাতগাছিয়া ও মনোহর দিঘির জামে মসজিদ
(পনেরো শতকের শেষভাগ অথবা ষোল শতকের প্রথম দিকের)। রাজকীয় গ্যালারি নেই অথচ
শিলালিপিতে জামে মসজিদ বলে উল্লিখিত একমাত্র মসজিদ হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ জেলার
রামপালের মসজিদ। এই মসজিদটি পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশের শেষ সুলতান জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ কর্তৃক ৮৮৮ হিজরিতে (১৪৮৩
খ্রি) নির্মিত হয়। চৌচালা খিলান বিশিষ্ট অপেক্ষাকৃত
ছোট স্থাপনার মধ্যে গৌড়-লখনৌতির চামকাটি মসজিদ (১৪৭৫), খনিয়াদিঘি মসজিদ ও লট্টন মসজিদ (পনেরো
শতকের শেষের দিকের),
বাগেরহাটের রণবিজয়পুর মসজিদ ও বিবি বেগনি মসজিদ (পনেরো শতকের মাঝামাঝি
সময়ের), বারো বাজারের জোড় বাংলা ও গোড়ার মসজিদ (পনেরো শেষ বা ষোল শতকের প্রথম দিকের), সোনারগাঁয়ের গোয়ালদি মসজিদ (পনেরো শেষ বা ষোল শতকের প্রথম দিকের) এবং
দিনাজপুরের সুরা মসজিদ (পনেরো শেষ বা ষোল শতকের প্রথম দিকের) অন্যতম।”[6] ১৩৪২
থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত ইলিয়াসশাহী ও হোসেন শাহী বংশের শাসনামলে বাংলার অখণ্ড ও
সার্বভৌম রাজশক্তি গড়ে উঠেছিল তা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির ভিত্তিকে
মজবুত করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। এ
বিষয়ে ডা: কালিরঞ্জন কানুনগোর মন্তব্য
“The
History of the Muslim principality of Lakhnawait emerges at the close of this
period as the History of Bengal proper with its well defined divisions,
Lakhnawati, Satgaon, Sonargaon and Chittagong.”[7]
বাংলায় আফগান শাসন:
শেরশাহ ১৫৩৪ সালে সুরুজগড়ের যুদ্ধের মাধ্যমে বিহার দখল করন
পরে বাংলা তার পদানত হয়। পরে তিনি হুমায়ুনকে পরাস্ত করে দিল্লীর শাসন পদানত করেন। ‘কবুলিয়াত-পাট্টা’, ‘ঘোড়ার ডাক’ ব্যবস্থাপনা, ‘দাম মুদ্রা’ এবং ঐতিহাসিক ‘গ্রাণ্ড ট্রাংক’ রোডের রুপকার ও অসাধারণ
উন্নয়নমূলক শাসনের সূচনা করলেও তার স্বল্প শাসনের পর বাংলা আবারো স্বাধীনভাবে চলতে
শুরু করে। বাংলার শাসনকর্তা মুহাম্মদ খান শামসুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ গাজী উপাধী ধারণ
করে স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতে থাকেন। এরপর কররানী আফগানরা বাংলা শাসন করেন।
আফগানদের বিরুদ্ধে মোঘল শাসকরা খড়গহস্ত ছিলেন বিধায় দিল্লীর ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের
পর তারা বাংলা করায়ত্ব করতে মনোনিবেশ করে। কিন্তু তারা সহসাই সফল হয়নি।
বারো ভূঁইয়াদের স্বাধীন বাংলা
মোঘলদের বাংলা দখলের বিরুদ্ধে ১৬ শতকের শেষে
এবং ১৭ শতকের শুরুতে বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম নেতা ঈশা খাঁ এগিয়ে আসেন। তিনি কয়েক বছর যাবত মোঘলদের দখলদারিত্বের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। সোনারগাঁয়ের জমিদার ঈশা খাঁ ও তার পুত্র
মুসা খাঁ।[8] বারো ভূঁইয়ারা কিছু সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হন।
দেশাত্ববোধের এক উজ্জলতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে বারো ভূইয়াদের উত্থান।[9]
মুঘল আমলে বাংলা
১৫৭৬ সালে দাউদ খান কররাণীর পরাজয়ের পর সম্রাট আকবরের মূল বারো সুবাহর একটি হিসেবে বাংলার নাম ঘোষণা
করেন। যার সীমানা ছিল বিহার, উড়িশা এবং মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলা ১৭১৭ সাল পর্যন্ত মোঘল সুবাহদারদের অধীনে শাসিত হতে থাকে।
এ সময় আরাকান বাংলার নিয়ন্ত্রনে আসে। উল্লেখযোগ্য মোঘল সুবাহদারদের মধ্যে যুবরাজ
শাহ সূজা, শায়েস্তা খান, মুহাম্মদ আজম শাহ, সুবেদার ২য় ইব্রাহিম খাঁ এবং যুবরাজ
আজিমুসশান বাংলা শাসন করেন। মুঘল আমলে বাংলা ছিল সবচেয়ে সম্পদশালী
প্রদেশ। মুঘল আমলে, সুবাহ বাংলা সমগ্র সাম্রাজ্যের শতকরা ৫০ ভাগ জিডিপি এর
যোগান দিত। বাংলা সমুদ্রগামী
জাহাজ ও বস্ত্র শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। এসময়কালে বাংলা দিল্লীর নিয়ন্ত্রণে শাসিত হয়।
সিরাজৌদ্দলা: বাংলার
শেষ স্বাধীন নবাব
মুঘল শাসন দূর্বল হয়ে পড়লে বাংলায় প্রায়-স্বাধীন নবাবদের শাসন প্রতিষ্ঠিত
হয়। যুবরাজ আজম-উস-শান এর আমলে তার প্রধানমন্ত্রী মুর্শিদকুলি
খাঁ বাংলার খুব ক্ষমতাবান একজন হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি
সাম্রাজ্যের রাজকোষের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। আজম-উস-শান
বিহারে চলে গেলে, ১৭১৭ সালে মুঘল আদালাত প্রধানমন্ত্রীর পদ বংশানুক্রমিক নবাবে উন্নীত
করেন। খান মুর্শিদাবাদে নতুন রাজধানী গড়েন। তার বংশধরেরা নাসিরি রাজবংশ গঠন করেন। আলীবর্দী
খান ১৭৪০ সালে নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। নবাব মূল বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার এক বিশাল
অংশ শাসন করেন।
নবাবী বাংলার শাসন ব্যবস্থাপনা ছিল অনেক উন্নত ও
প্রাগ্রসরমান। ১৭৫৭ সলে পলাশীর যুদ্ধ ও ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট
ইন্ডয়া কোম্পানি বাংলায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে। বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার
শেষ স্বাধীন শাসক নবাব সিরাজৌদ্দলাকে প্রতারণার মাধ্যমে পরাস্ত করার মধ্য দিয়ে
শুধু বাংলাই নয়; সমগ্র ভারত বর্ষের স্বাধীনতার র্সূয নির্বাপিত হয়। এতে বুঝা
যায়, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে শাসন, সম্পদ,
অবস্থান, মর্যাদা ও কর্তৃত্বে বাংলার অবস্থান
কত উঁচূতে ছিল। এমনকি বাংলায় বৃটিশদের লুঠতরাজ তৎকালিন বৃটেনে শিল্প বিপ্লবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলা থেকে নিয়ে যাওয়া পুঁজি বৃটেনের
বিভিন্ন শিল্পে, বিশেষ করে বস্ত্র
শিল্পে বিনিয়োগ করে, বৃটিশরা প্রভূত
সম্পদের অধিকারী হয়েছিল।একই সাথে,
এই
লুঠতরাজের ফলে বাংলায় শিল্পায়ন ব্যহত হয়। দ্বৈত শাসনের ফলে বাংলায় ইতিহাসে প্রথম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৭৭০ সালের দূর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশেরও বেশী লোক
মারা যায়। কোন কোন গবেষণা মতে, দূর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার অর্ধেক।[10]
ব্রিটিশদের পতন ও বাংলার স্বাধীনতা
আন্দোলনে বিভিন্ন স্তর
ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতে আগমনকারী ব্রিটিশরা ১৭৫৭ সালে
বাংলা দখল করে ক্রমান্বয়ে সমগ্র ভারতের উপর শাসন ও শোষন বিস্তৃত করে। তাদের
অত্যাচার আর নির্যাতনমূলক শাসনে এদেশের সকল ঐতিহ্য ও প্রবৃদ্ধির পতন ঘটে। ভাগ কর,
শাসন কর (Devide and Rule)- এ নীতির কারণে হাজার বছরের হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক
সম্প্রীতির অবনতি হয়। মুসলিমদের ক্ষমতাচ্যুত করে চীরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে
অধিকাংশ জমিদারী নিলামে তোলা হয়। ব্যবসায়ী হিন্দুরা সেসব কিনে নেয়। রাতারাতি
ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। বাংলার স্বাধীনতার
প্রদীপ ২০০ বছরের জন্য নির্বাপিত হয়। এ
সময়কালে বাংলার জনগণ একেবারে নির্লিপ্ত বসে থাকে নি। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তারা
বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে তোলে। এসব স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে ফকির সন্নাসী বিদ্রোহ
(১৭৬০-১৮০০), রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩), বরশিালের বলাকী শাহের বিদ্রোহ
(১৭৯১-৯২), সিলেটের আগা মোহাম্মদ রেজার বিদ্রোহ (১৭৯৯), পার্বত্য চট্টগ্রামের
চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৭-৮৭) এবং জামালপুরের পাগলপন্থীদের বিদ্রোহ(১৮২৫-৩৩) অন্যতম।
এছাড়া রাজা রাম মোহন রায়, ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়াত উল্লাহ ও(১৮২০-৪০)
তার পুত্র দুদু মিয়া (১৮৪০-৬২), মীর নিসার আলী তিতুমীরের (১৮২৭-৩১) প্রমূখ মুসলিম
সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী নেতাদের প্রভাবে বাংলার স্বাধীনতাকামী জনসাধারণ ইংরেজদের
শোষনের বিরুদ্ধে বারবার প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে।
ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলার ভূমিকা
ভারত স্বাধীন হয় দীর্ঘ দিনের প্রতিরোধ প্রতিবাদ-সংগ্রামর
মধ্য দিয়ে। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা হয়
বাংলায়। পশ্চিম বাংলার ব্যারাকপুরে মঙ্গলবার পান্ডের নেতৃত্বে এ বিদ্রোহের সূচনা
হয়। পরে তা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। সিপাহী বিদ্রোহে বাংলার
সিপাহী জনতা একাকার হয়ে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে তাড়াতে অস্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বহরমপুরসহ বাংলার বিভিন্ন জায়গায় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সিপাহীদের বিদ্রোহ দিয়ে শুরু হলেও এ
সংগ্রাম পরবর্তীকালে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, অযোদ্ধা, বিহারসহ
বাংলার সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন লাভ করে মহা বিদ্রোহের রুপ ধারণ করে। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘এ বিদ্রোহ ছিল গণবিদ্রোহের প্রতীক।’ বাংলার
জনগণের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহ পরবতীকালে রাজনৈতিক ও স্বাধীনতার জাতীয় সংগ্রামের
স্বীকৃতি পায়। ইংরেজরা এ বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে। বাংলাদেশের ঢাকার বাহাদুর শাহ
পার্কে দেশপ্রেমী এসব বাঙালির ৭২ জনকে ফাঁসি দেয়া হয়। বাঙালিসহ প্রায় ১,০০,০০০ ভারতীয়কে ইংরেজরা নির্মমভাবে হত্যা করে। তাদের স্মরণে ১৯৪৭ সালে ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে নির্মিত স্মৃতিফলক
এখনও এ বিদ্রোহে বাংলার অবদানে সাক্ষী বহন করছে। বাংলার জনগণের সমর্থনপুষ্ট এ সিপাহী
বিপ্লব আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ মনে হলেও পারবর্তীকালের জন্য সব সংগ্রামের সূচনা বা
সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে। তাই এসব কাজের মধ্য দিয়ে সিপাহী বিদ্রোহে বাংলার অসামান্য অবদান
স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভারত-পাকিস্থানের জন্ম ও বাংলার স্বাধীনতার সূচনাকাল
পাকিস্তানের
স্বাধীনতার সময়ে বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। বাংলার পশ্চিম অংশ ভারতের একটি
রাজ্যে পরিনত হয়। পূর্ব অংশ যুক্ত হয় পাকিস্তানের সাথে। পূর্ব পাকিস্থান
নামে আজকের বাংলাদেশ পথ চলা শুরু করে। ১৯৪৭
সালে ভারত পরবর্তিতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ নামে
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।[11] সুতরাং ভারত-পাকিস্থানের অভ্যুদয়
প্রকারান্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্ণত করাই যায়।
ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার বীজ
পাকিস্থানের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
বাঙ্গালীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য প্রথম ভাষার উপর আঘাত হানেন।পাকিস্থানের
শতকরা ৫৬ জনের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অথচ অধিকাংশ জনগণের ভাষাকে উপেক্ষা করে ১৯৪৮ সালে
২১ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায় জিন্নাহ ঘোষণা করেন, “উর্দূ এবং উর্দূই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা।” তাঁর এরুপ উক্তিতে আপামর বাঙ্গালী জনসাধারণ
বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ১৯৫০ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণ পরিষদে ঘোষণা করেন-উর্দূই
পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হবে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতে থাকে। গঠিত হয় সর্ব দলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। তমদ্দুন
মজলিসের নেতৃত্বে ডাকসুর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ লিপি দেয়া হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী
রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়। এদিন মিছিল, হরতাল ও সভা- শেঅভাযাত্রার
কর্মসূচি নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু সরকার ২০ তারিখ থেকে সব ধরণের কর্মসূচীর উপর পরবর্তী
একমাস পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলের উদ্যোগ নিলে
পুলিশ মিছিলে গুলি করে। ফলে শাহাদাত বরণ করে সালাম, রফিক, জব্বর,বরকত প্রমূখরা। বিংশ
শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম রক্তাক্ত প্রতিবাদ ছিল ভাষা আন্দোলন।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি
১৯৪৭-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের অপশাসনের
বিরুদ্ধে জনগণ বিক্ষুব্দ হয়।ফলে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে
যুক্তফ্রন্টের নামে নির্বাচনী ঐক্যজোট গঠিত হয়। আওয়ামীলীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে
ইসলাম ও গণতন্ত্রী দল মিলে পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্ব শাসন ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার
দাবী নিয়ে নির্বাচন করে জয়ী হয়।মন্ত্রী সভা গঠিত হয়। কিন্তু দুমাসের মধ্যে এ মন্ত্রী
সভা বাতিল করে জরুরী অবস্থা জারী করা হয়। জনগণ
আন্দোলনে ফেটে পড়ে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক বাহিনী শাসন ক্ষমতা দখল করে।
ফলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়। বাংলার বেশীর ভাগ নেতারা
এসময় বার বার কারারুদ্ধ হন। অনেক জনসাধারণ বন্দী জীবন কাটায়। আস্তে আস্তে স্বাধীনতার
বীজ অংকুরিত হতে থাকে।
ছয়দফা গণঅভ্যূত্থান এবং স্বাধীনতার
মশাল
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে
বাঙ্গালী সৈন্যরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে ভারতে কে হারিয়ে দেয়। অথচ বাংলার প্রতি
শাসকদের বৈষম্য নীতি নেতৃবৃন্দসহ সচেতন নাগরিকদের দারুনভাবে আহত করে। ১৯৬৬ সালে ১৩
ফেব্রুয়ারী বিরোধী দলীয় নেতারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ঐতিহাসিক লাহোরে রিখিল
পাকিস্থান জাতীয় কনফারেন্স আহবান করেন। আওয়ামীলীগের সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর
রহমান পূর্ব পাকিস্থানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবী হিসেবে এক কর্মসূচী পেশ করেন-
যা ঐতিহাসিক ছয় দফা নামে পরিচিত। শাসক শ্রেণী
ছয় দফার ন্যয্যতা বিচার না করে মামলা-হজামলার মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে
থাকে। ১৯৬৮ সালে ভারতের আগরতলায় দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ
এনে শেখ মুজিবর রহমানকে প্রধান আসামী করে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।এজন্য
এটিকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ও বলা হয়।১৯৬৯ সালে ছাত্র জনতার ১১ দফা আন্দোলন
বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে পশ্চিম পাকিস্থানেও ছড়িয়ে পড়ে । আইয়ুব খানের পতন হলো। তবে
স্বাধীনতার পথ এতা সহজ ছিল না। নতুন ক্ষমতায় এলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি ১৯৭০
সালের ৫ অক্টোবর নির্বাচনের মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধোনে আগ্রহী হলেন।ইতোমধ্যে
বন্যার কারণে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে যায়। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বাংলাদেশে
আওয়ামীলীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু সরকার নব নির্বাচিতদের হাতে
ক্ষমতা হস্তান্তরে টাল-বাহান করতে থাকে। ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের সভা অনির্দিষ্টকালের
জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেন ইয়হিয়া খান।বঙ্গবন্ধূ দেখলেন যে, শুধু আন্দোলন করে
জাতীয় দাবী পূরণ হচ্ছে না, তখন তিনি চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ৭ মার্চ
রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষন দেন। স্বাধীনতার মশাল প্রজ্জলিত হয় মূলত এ ভাষণের মধ্য
দিয়েই।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ
বাংলার স্বাধীনতা ইতিহাসের
বাঁকে বাঁকে বার বার বিদেশী ও পরাশক্তির হাতে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এদেশের জনগণ
তা পুনরুদ্ধার করেছে স্বাধীনতার মন্ত্র বুকে নিয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাত্রে
পাক হানাদর বাহিনী নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করে। সে রাত দেড়টার
দিকে পাকিস্থানী বাহিনীআওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে
যায়। গ্রেফতারের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণার একটি লিখিত বাণী চট্টগ্রামের জহুর হোসেন চৌধূরীসহ
আওয়ামীলীগের অন্যান নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন:
“This may be my last message, from today Bangladesh is
independent, I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and
with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your
fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is
expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.” [12]
এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই
নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহবান
জানাচ্ছি। পাকিস্থান দখলদার সেনাবাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে
বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে
।”
এভাবে দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা আর শোষনের পরে বাংলার স্বাধীনতা
ফিরে আসে। পেছনে রেখে যায় দুঃসহ স্মৃতি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্রিশ লক্ষ শহীদের
আত্মত্যাগ আর প্রায় দুলক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ স্বাধীনতা।
রক্ত দিয়ে কেনা এ স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা দৃঢ় প্রত্যয়ী।
স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের করণীয়:
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে
কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন, দিয়েছেন চিন্তার স্বাধীনতা। ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কর্ম
ও চিন্তার স্বাধীনতারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পৃথিবীতে যখন খৃষ্টান ধর্মাশ্রিত বাইজান্টাইন শাসনামলে জোর করে ধর্ম পালনে বাধ্য
করা হতো। ধর্ম পালনে কোন স্বাধীনতা ছিল না। শাসকরা বলতো: “হয়
খ্রিস্টান হও, না হয় মরো”। মহানবী সা: এর কণ্ঠে ঠিক তখনই ধ্বনিত হল আল কুরআনের চিরন্তন
বাণী : “ধর্মের
ব্যাপারে কোনো বাড়াবাড়ি নয়।” ইসলামের এ ঘোষণা
যখন উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন পারস্যেও বিরাজ করছিল অস্বাভাবিক অবস্থা। অন্য ধর্মের
লোকদের সমাজে কোনঠাসা করে রাখা হতো। অথচ ইসলাম ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্ম বা বিশেষ কোনো
ধর্মগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দমননীতি অনুমোদন করে না। এ প্রসঙ্গে কোরানের
বক্তব্য, ‘এবং যদি তোমার
প্রভু ইচ্ছা করতেন তাহলে পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী সকল মানুষকেই এক সাথে বিশ্বাসী
বানিয়ে ফেলতে পারতেন। সুতরাং (হে মুহম্মদ!) তুমি কি তাহলে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য
লোকদের বাধ্য করতে চাও?’[13] মাদানী যুগেও আমরা আল কুরআনের এই
বিস্ময়কর প্রকাশ দেখতে পাই: ‘ধর্মের ক্ষেত্রে জবরদস্তি নেই। মিথ্যা থেকে সত্যকে
যথার্থভাবেই পৃথক করে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে।’[14] রাষ্ট্র ও জাতি হিসেবে স্বাধীন না
থাকলে কিংবা পরাধীন থাকলে ধর্ম-কর্ম পালনের সুযোগ সীমিত হয়ে আসে। ইসলাম সে জন্য
দেশপ্রেম ও দেশের সীমানা প্রহরীদের বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। উসমান (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসুলে পাক
(সা:) ইরশাদ করতে শুনেছি, (আল্লাহর পথে) একদিন সীমান্ত রক্ষার কাজে নিযুক্ত থাকা হাজার দিনের মনজিল
অতিক্রম অপেক্ষা উত্তম। এছাড়াও দেশপ্রেমকে জাহান্নামের রক্ষাকবচ হিসেবে উল্লেখ করে
রাসুলে পাক (সা:) ইরশাদ করেছেন, দুই ধরনের চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন কখনও স্পর্শ করবে
না, ১. সেই
চক্ষু যে চক্ষু সর্বদা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, ২. যে চক্ষু আল্লাহর পথে (সীমান্ত) পাহারাদারি করে সমস্ত রাত কাটিয়ে দেয়।[15]
উল্লেখপঞ্জি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লি:, ঢাকা, ২০১৩
কে. এম . রাইছ উদ্দিন,
বাংলার ইতিহাস পরিক্রমা, খান ব্রাদার্স
এণ্ড কো:, ঢাকা, পূনঃমুদ্রণ: ২০০৭
মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, বাংলা ও বাংগালীঃ
মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা, বাংলাদেশ কো অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেড, ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ-২০০৬
বাংলাপিডিয়া, অনলাইন ভার্সন
মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, প্রথম পর্ব,
কমল চৌধূরী সম্পাদিত, দে’জ পাবলিশিং,
কলকাতা, ২০০৮
History of Bengal, Publication committee, University
of Dacca, vol.-II, 1943
[1] আরবী কবিতাটি
হচ্ছে- “আন্নাসু মিন জিহাতিত্ তিমছালে আকফাউন- আবুহুম আদামু
ওয়াল উম্মু হাওয়াইন” কাব্যানুবাদ:প্রবন্ধকার
[3] ড. আহমাদ হাসান দানী,, শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ,
শাহ-ই-বাংগালা,
বেংগল লিটারেরী রিভিউ, এপ্রিল- ১৯৫৭, পৃ. ১৯-২২, উদ্ধৃত মোহাম্মাদ আব্দুল মান্নান,
মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, ফুটনোট ১২ পৃ.৪
[8] মুসা খাঁ এর কবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্লাহ হলের পাশ্বে রয়েছে।কবরের
সন্নিকটে তার নামে মসজিদটির নামও মুসা খাঁ মসজিদ। যা আজো বারো ভূঁইয়াদের স্মৃতিকে অম্লান
করে রেখেছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষার্থী এ বিষয়ে জানে?
[11] John L.
Esposito (2004), The Islamic World: Past and Present 3-Volume Set,
p.190, Oxford University Press, quoted in https://bn.wikipedia.org/wiki


Comments
Post a Comment