দান- করার ফযীলত ও প্রয়োজনীয়তা
দান করার ফযীলত ও প্রয়োজনীয়তা
লেখক ও সংকলক:
ড.
কাজী
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
নির্বাহী
পরিচালক
সীরাত
স্টাডি সেন্টার,
ঢাকা
মোবাইল:
+৮৮০১৭১১৪৭৫৮৮৭
omorbinkarim@gmail.com
ভূমিকাঃ
দান
করার প্রসংগ আসলেই দানকারী
মনে করে,
তার
সম্পদ;
শেষ
হয়ে গেল গেল। অনেকেরই তাই কষ্ট
হয় দান করতে। অধিকাংশই বাধ্য
হয়ে বা অবস্থার চাপে পড়ে দান
করে থাকে। অনেকে পরিস্থিতির
কারণে দান করে থাকেন। অনেকে
লোক দেখানোর জন্য দান করেন-
আমরা
তাদের কথা নাই বা বললাম। মানুষ
স্বভাবতই কৃপণ। তাই আল্লাহ ﷻ তায়ালা দানের বিষয়ে কুরআন ও
হাদীসের মাধ্যমে আমাদের
উদ্ধুদ্ধ করেছেন। এর বিনিময়ে
আমাদের কী দেয়া হবে সে ব্যপারে
বার বার পুরষ্কারের কথা বলেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা যে
সম্পদ অর্জন করি বা মালিকানা
লাভ করি,
তা
কী আমাদের একক মালিকানার বিষয়?
না
আসলে তা নয়;
আমরা
মূলতঃ সম্পদের সংরক্ষণ করে
থাকি। আমাদের মৃত্যুর পরে
অসংখ্য হকদারেরা মালিক হয়ে
বসবে। আর আমাদের অনেকের
জীবদ্দশাতেই সম্পদের বিবাদ
নিয়ে নানান কিচ্ছা কাহিনীর
বিবরণ সচেতনের কাছে
দৃশ্যমান। আসুন জেনে নেই দান
করার ফজিলাত নিয়ে সংকলিত
কিছু ামীয় বাণী।
দান-ছাদকা করলে সম্পদ কমে না:
দানে
সম্পদ কমে না। বাহ্যিকভাবে
মনে হয় সম্পদ কমে যাচ্ছে।
শয়তার প্রতিনিয়ত আমাদের সে
বিষয়ে কারভারী করে রাখছে। এ
প্রসংগে তিরমিজির বিখ্যাত
হাদীসটি জেনে নেই। কাবশা আল
আনমারী (রা:) থেকে
বর্ণিত, তিনি
শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন:
” مَا نَقَصَ مَالُ عَبْدٍ مِنْ صَدَقَة
অর্থ্যাৎঃ
“ছাদকা করলে কোন মানুষের সম্পদ
কমে না।” (তিরমিযী, ইবনে
মাজাহ)
দান সম্পদকে বৃদ্ধি করে:
দানের
মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
কুরআনে আল্লাহ পাক ﷻ এরশাদ করেন:
مَثَلُ
الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ
فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ
أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ
سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ
يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ
وَاسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থ্যাৎঃ“যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মত যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। আর প্রতিটি শীষে একশতটি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ।” (সূরা বাকারা-২৬১)
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেন:
مَنْ
أَنْفَقَ نَفَقَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ
كَانَتْ لَهُ بِسَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ
অর্থ্যাৎঃ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোন
কিছু ব্যয় করবে তাকে সাতশত
গুণ ছওয়াব প্রদান করা হবে।”
(আহমাদ,
সনদ
ছহীহ)
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও
বলেন:
“যে
ব্যক্তি নিজের হালাল কামাই
থেকে-আল্লাহ ﷻ হালাল কামাই ছাড়া দান কবুল
করেন না-
একটি
খেজুর ছাদকা করে,আল্লাহ
উহা ডান হাতে কবুল করেন অতঃপর
তা বৃদ্ধি করতে থাকেন-যেমন
তোমরা ঘোড়ার বাচ্চাকে প্রতিপালন
করে থাক-এমনকি
উহা একটি পাহাড় পরিমাণ হয়ে
যায়।”(বুখারী
ও মুসলিম)
দানকারীর জন্য ফেরেশতা দু ’আ করে থাকেঃ
দানকারীর
জন্য আল্লাহ তাবারাকা ওয়া
তায়ালার ফেরেশতাকুল দু’আ করে
থাকে।
আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন:
আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন:
(ما
من يوم يصبح العباد فيه إلا ملكان ينزلان
فيقول أحدهما: اللهم
أعطِ منفقاً خلفاًً، ويقول الآخر: اللهم
أعطِ ممسكاً تلفاً)([1])،
متفق عليه.
অর্থ্যাৎঃ প্রতিদিন
সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ
করেন। তাদের একজন দানকারীর
জন্য দু’ আ করে বল, “হে
আল্লাহ দানকারীর মালে বিনিময়
দান কর। (বিনিময়
সম্পদ বৃদ্ধি কর)” আর
দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদ
দু’আ করে বলেন “হে আল্লাহ
কৃপণের মালে ধ্বংস দাও।” (বুখারী
ও মুসলিম)
দানকারীর দুনিয়া আখিরাতের সকল বিষয় সহজ করে দেয়া হয়:
আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন:
مَنْ
يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ اللَّهُ
عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
অর্থ্যাৎঃ
”যে ব্যক্তি কোন অভাব গ্রস্তের
অভাব দূর করবে, আল্লাহ ﷻ তার দু’নিয়া ও আখিরাতের সকল
বিষয় সহজ করে দিবেন।” (মুসলিম)
গোপনে দান করার ফযীলতঃ
গোপন-প্রকাশ্যে
যে কোনভাবে দান করা যায়। সকল
দানেই ছওয়াব রয়েছে। আল্লাহ
বলেন:
إِنْ
تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ
وَإِنْ تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا
الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
وَيُكَفِّرُ عَنْكُمْ مِنْ سَيِّئَاتِكُمْ
অর্থ্যাৎঃ
“যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত
কর, তবে
তা কতই না উত্তম। আর যদি গোপনে
ফকীর-মিসকিনকে
দান করে দাও, তবে
এটা বেশী উত্তম। আর তিনি তোমাদের
পাপ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন।” (সূরা
বকারা- ২৭১)
গোপনে দানকারী কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নীচে ছায়া লাভ করবে:
নবী ﷺ বলেন,
“কিয়ামত
দিবসে সাত শ্রেণীর মানুষ আরশের
নীচে ছায়া লাভ করবে।…তাদের
মধ্যে যে একটি শ্রেণী হচ্ছে-
:وَرَجُلٌ
تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا
حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا
تُنْفِقُ يَمِينُهُ
অর্থ্যাৎঃ “এক ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কি দান করে বাম হাত জানতেই পারে না।” (বুখারী ও মুসলিম)
অর্থ্যাৎঃ “এক ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কি দান করে বাম হাত জানতেই পারে না।” (বুখারী ও মুসলিম)
দান-ছাদকা গুনাহ মাফ করে ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়:
নবী ﷺবলেন:
“হে
কা‘ব বিন উজরা! ছালাত (আল্লাহর) নৈকট্য
দানকারী, ছিয়াম
ঢাল স্বরূপ এবং দান-ছাদকা
গুনাহ মিটিয়ে ফেলে যেমন পানি
আগুনকে নিভিয়ে ফেলে।” (আবু
ইয়ালা, সনদ
ছহীহ)
রাসূলুল্লাহ ﷺবলেন: والتقوالنَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ
রাসূলুল্লাহ ﷺবলেন: والتقوالنَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ
"খেজুরের একটি অংশ দান করে
হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন
থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা
কর।” (বুখারী
ও মুসলিম)
মানুষ কিয়ামতে দান-ছাদকার ছায়াতলে থাকবে:
উক্ববা
বিন আমের (রা:) থেকে
বর্ণিত। নবী ﷺবলেন:
“নিশ্চয় দান-ছাদকা দানকারী থেকে কবরের গরম নিভিয়ে দিবে। আর মু’মিন কিয়ামত দিবসে নিজের ছাদকার ছায়াতলে অবস্থান করবে।” (ত্ববরানী, বাইহাক্বী, সনদ ছহীহ)
“নিশ্চয় দান-ছাদকা দানকারী থেকে কবরের গরম নিভিয়ে দিবে। আর মু’মিন কিয়ামত দিবসে নিজের ছাদকার ছায়াতলে অবস্থান করবে।” (ত্ববরানী, বাইহাক্বী, সনদ ছহীহ)
লোক দেখানোর জন্য দান
কিন্তু
বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এমন
আছে,
যারা
অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে
দান করে এবং তা মানুষকে দেখানোর
জন্য। মানুষের ভালবাসা নেয়ার
জন্য। মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর
জন্য। মানুষের মাঝে গর্ব
অহংকার প্রকাশ করার জন্য।
অনেকে দুনিয়াবি স্বার্থ
সিদ্ধির জন্যও দান করে থাকে।
যেমন, চেয়ারম্যান
বা এমপি নির্বাচনে জেতার
উদ্দেশ্য দান করে। কিন্তু
দান যদি একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহ ﷻ-্এর সন্তুষ্টির জন্য না হয় তা
দ্বারা হয়ত দুনিয়াবি কিছু
স্বার্থ হাসিল হতে পারে কিন্তু
আখেরাতে তার কোন প্রতিদান
পাওয়া যাবে না। হাদীছে কুদসীতে
নবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহ ﷻ বলেন:
أَنَا
أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ
مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ
“
অর্থ্যাৎঃ
“আমি শির্ককারীদের শিরক থেকে
মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন আমল
করে তাতে আমার সাথে অন্যকে
শরীক করবে, তাকে
এবং তার শির্কী আমলকে আমি
পরিত্যাগ করব।” (মুসলিম)বরং
যারা মানুষের প্রশংসা নেয়ার
উদ্দেশ্যে দান করবে,
তাদের
দ্বারাই জাহান্নামের আগুনকে
সর্বপ্রথম প্রজ্বলিত করা
হবে।
শেষ কথা:
শেষে
না বললেই নয়;
কেউ
কেউ মনে করতে পারে যে,
তারাই
দান করবে,
যাদের
অগাধ টাকা আছে। কিন্তু বিষয়টা
আসলে তা নয়। সামথ্য অনুযায়ী
দান করতে হবে। কেউ ১ টাকা দিবে
আবার কেউ ১০০ টাকা দিবে,
কেউ
৫০০ টাকা দিবে আবার কেউ সামথ্য
অনুযায় ৫০০০/-
টাকাও
দিতে পারে। আবার কেউ ১ লক্ষ
টাকা দান করতে পারে। সওয়াব
কিন্ত সবার সমান। কারণ মনে
রাখতে হবে,
নিয়তটাই
এখানে অগ্রগণ্য। হাদীসের
অন্যতম বিশুদ্ধ গ্রন্থ কিতাবুল
বুখারীর ১ম হাদীসটি নিয়তের
বিষয়েই বলা আছে কিন্ত্ত।
সুতরাং আসুন আমরা আমাদের তৌফিক অনুযায়ী নিজেদের আত্নীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, অপরিচিত ব্যক্তিদেরকে দান করি। নিজে লাভবান হই; অন্যকে লাভবান হতে সাহায্য করি। অন্যকে অভাবমুক্ত করার মাধ্যমে স্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করি। আল্লাহ ﷻ আমাদের কবুল করুন, আমিন।
সুতরাং আসুন আমরা আমাদের তৌফিক অনুযায়ী নিজেদের আত্নীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, অপরিচিত ব্যক্তিদেরকে দান করি। নিজে লাভবান হই; অন্যকে লাভবান হতে সাহায্য করি। অন্যকে অভাবমুক্ত করার মাধ্যমে স্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করি। আল্লাহ ﷻ আমাদের কবুল করুন, আমিন।

Nice
ReplyDelete